ডায়াবেটিস কি?
ডায়াবেটিস শব্দটি আমরা প্রায়শই শুনে থাকি। এটি মূলত একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক অসুস্থতা, যা আমাদের শরীরের রক্তে গ্লুকোজ বা চিনি মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। শরীরে ইনসুলিন নামক হরমোনের ঘাটতি বা ইনসুলিনের কার্যক্ষমতায় সমস্যা দেখা দিলে ডায়াবেটিসের জন্ম হয়। এই রোগকে সহজভাবে বলা যায়, শরীরে শক্তি উৎপাদনের মূল উপাদান গ্লুকোজ যখন সঠিকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে না, তখন রক্তে এর পরিমাণ বেড়ে যায় এবং তা নানা জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতিদিন কয়েক লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। বাংলাদেশও এই ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে। ডায়াবেটিস শুধু একটি রোগ নয়, এটি হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা, চোখের রোগসহ নানা জটিলতার প্রধান কারণ হতে পারে। তাই ডায়াবেটিসকে ছোট রোগ ভেবে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
আমরা যখন ডায়াবেটিসকে বুঝতে চেষ্টা করি, তখন প্রথমেই জানতে হয়—কেন এটি হয় এবং কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়। প্রতিটি মানুষের জন্য এটি জানা অত্যন্ত জরুরি কারণ এটি যে কাউকে, যেকোনো বয়সে আক্রান্ত করতে পারে।
ডায়াবেটিসের ইতিহাস ও গুরুত্ব
ডায়াবেটিসের ইতিহাস বহু প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালের মিশরীয় নথিতে এই রোগের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। তখন এটি “মিষ্টি প্রস্রাবের রোগ” হিসেবে পরিচিত ছিল। মূলত, ডায়াবেটিস শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘diabainein’ থেকে, যার অর্থ ‘ভিত্তি দিয়ে যাওয়া’। আর ‘mellitus’ অর্থ ‘মধুর মতো’। কারণ প্রাচীন চিকিৎসকরা রোগীর প্রস্রাবের স্বাদ নিয়ে রোগ নির্ণয় করতেন, এবং সেটি মিষ্টি স্বাদের হলে তাঁরা বুঝতেন রোগী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
ডায়াবেটিসের গুরুত্ব বোঝা যায় এর ভয়াবহ পরিণতি থেকে। এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়া, অন্ধত্ব এমনকি পায়ের পচন এবং অঙ্গহানির কারণও হতে পারে। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ এই রোগের কারণে অকাল মৃত্যু বরণ করে। তাই ডায়াবেটিস শুধু একক কোনো সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভাব এবং বংশগত কারণে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। তাই এখনই সময় ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার।
ডায়াবেটিস কিভাবে হয়?
ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। সাধারণত ইনসুলিন নামক হরমোনের অপ্রতুলতা বা ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ না করলে ডায়াবেটিস দেখা দেয়। ইনসুলিন আমাদের অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত হয় এবং এটি রক্তের গ্লুকোজকে কোষে প্রবেশ করাতে সাহায্য করে। যখন ইনসুলিন নেই বা তা কার্যকর নয়, তখন গ্লুকোজ রক্তে থেকে যায় এবং এর মাত্রা বেড়ে যায়।
ডায়াবেটিসের পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ হলো:
- জেনেটিক বা বংশগত কারণ: যদি পরিবারে আগে থেকে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকে, তাহলে ঝুঁকি অনেকগুণ বেড়ে যায়।
- অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত ক্যালোরি, চিনি, ফাস্টফুড এবং তেলযুক্ত খাবার ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
- অলস জীবনধারা: শারীরিক পরিশ্রমের অভাব রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ করে তোলে।
- ওজন বৃদ্ধি: স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন ডায়াবেটিসের অন্যতম বড় কারণ।
- বয়স: বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
অর্থাৎ ডায়াবেটিস কেবল একটি রোগ নয়, এটি আমাদের জীবনযাপনের প্রতিফলন। তাই সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং নিয়মিত পরীক্ষা খুব জরুরি।
জেনেটিক ফ্যাক্টর বনাম জীবনধারা
অনেকে মনে করেন ডায়াবেটিস হলে সেটা শুধুই বংশগত কারণে হয়। তবে বাস্তবতা হলো, ডায়াবেটিসের জন্য বংশগতি এবং জীবনধারা দুই-ই সমানভাবে দায়ী। যেমন, বাবা-মায়ের কারো ডায়াবেটিস থাকলে সন্তানদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে শুধুমাত্র বংশগতি নয়, জীবনধারা এ রোগকে উস্কে দেয় বা প্রতিরোধ করতে পারে।
যারা স্বাস্থ্যকর খাবার খান, নিয়মিত ব্যায়াম করেন, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তাদের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেক কম থাকে। বিপরীতে যারা অলস জীবনযাপন করেন, অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে ডায়াবেটিস সহজেই বাসা বাঁধতে পারে—even যদি পরিবারে ইতিহাস না থাকে।
জীবনধারা পরিবর্তন করে আপনি ডায়াবেটিসের হাত থেকে নিজেকে অনেকাংশেই রক্ষা করতে পারেন। সুতরাং বংশগত ঝুঁকি থাকলেও সচেতন থেকে আপনি সুস্থ জীবনযাপন করতে পারবেন।
ডায়াবেটিসের প্রকারভেদ
ডায়াবেটিস মূলত চারটি ধরণের হয়ে থাকে। প্রতিটি ধরণের পেছনে রয়েছে আলাদা কারণ, উপসর্গ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি। চলুন একে একে জেনে নিই:
টাইপ ১ ডায়াবেটিস
টাইপ ১ ডায়াবেটিসকে সাধারণত শিশু ও কিশোর বয়সে বেশি দেখা যায়। একে ইনসুলিন-নির্ভর ডায়াবেটিসও বলা হয়। এতে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলবশত ইনসুলিন তৈরি করা কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে শরীরে ইনসুলিন একেবারেই তৈরি হয় না। এই অবস্থায় রোগীকে সারাজীবন ইনসুলিন ইনজেকশন নিতে হয়।
টাইপ ২ ডায়াবেটিস
টাইপ ২ ডায়াবেটিস সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং মূলত বয়স্কদের মধ্যে সাধারণ হলেও এখন কম বয়সীরাও আক্রান্ত হচ্ছে। এতে শরীর ইনসুলিন তৈরি করলেও তা ঠিকমতো কাজ করে না। মূলত স্থূলতা, অলসতা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এর কারণ।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস
গর্ভবতী নারীদের মধ্যে ডায়াবেটিসের একটি বিশেষ ধরণ দেখা যায় যাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বলে। সাধারণত গর্ভাবস্থায় হরমোনের তারতম্যের কারণে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যায়। জন্মের পর এটি ঠিক হয়ে গেলেও ভবিষ্যতে মায়ের টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
অন্যান্য বিরল ধরণের ডায়াবেটিস
এছাড়াও কিছু বিরল ধরণের ডায়াবেটিস রয়েছে, যেমন মডি (MODY), লাডা (LADA) ইত্যাদি। এসব ধরণের পেছনে জেনেটিক মিউটেশন বা অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া দায়ী।
ডায়াবেটিসের উপসর্গসমূহ
ডায়াবেটিসের উপসর্গগুলো প্রাথমিক অবস্থায় খুব বেশি স্পষ্ট না-ও হতে পারে। অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষণগুলো স্পষ্ট হতে থাকে এবং জটিলতাও বাড়তে থাকে। তাই উপসর্গগুলো সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরি, যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
প্রাথমিক লক্ষণ
ডায়াবেটিসের শুরুতে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা যায়, যা অনেক সময় আমরা অবহেলা করি। এই প্রাথমিক উপসর্গগুলো হলো:
- প্রচণ্ড পিপাসা লাগা: রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে দেহ পানি হারাতে থাকে। ফলে সবসময় প্রচণ্ড পিপাসা অনুভব হয়।
- ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া: রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ কিডনি ফিল্টার করতে পারে না, তাই প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর তা বের করার চেষ্টা করে। ফলে ঘন ঘন প্রস্রাব হয়।
- অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগা: গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করতে না পারলে শরীর শক্তির ঘাটতি অনুভব করে, যা অতিরিক্ত ক্ষুধার কারণ হয়।
- অজানা কারণে ওজন হ্রাস: বিশেষ করে টাইপ ১ ডায়াবেটিসে ওজন দ্রুত কমতে থাকে কারণ শরীর চর্বি এবং পেশী ভাঙতে শুরু করে।
- ক্লান্তি ও দুর্বলতা: শক্তি উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায় রোগী সবসময় দুর্বল বোধ করেন।
- দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া: উচ্চ রক্তে শর্করা চোখের লেন্সে পানি টেনে আনে, ফলে দৃষ্টিশক্তি ক্ষণস্থায়ীভাবে ঝাপসা হয়ে যায়।
এই প্রাথমিক উপসর্গগুলো দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায়ই সঠিক চিকিৎসা শুরু করা গেলে জটিলতা অনেকাংশে এড়ানো যায়।
উন্নত পর্যায়ের উপসর্গ
যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না রাখা যায়, তাহলে রোগটি বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। উন্নত পর্যায়ে ডায়াবেটিসের উপসর্গগুলো আরও ভয়াবহ হতে শুরু করে। যেমন:
- হাত–পায়ে অবশ ভাব বা ঝিঁঝি ধরা: স্নায়ুর ক্ষতির কারণে এ ধরনের অনুভূতি হতে পারে, যা ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির লক্ষণ।
- ফোলা পা ও পায়ের ক্ষত সেরে উঠতে দেরি হওয়া: রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হলে ক্ষত সহজে শুকায় না।
- ত্বকে সংক্রমণ বা ফুসকুড়ি: ডায়াবেটিস রোগীদের ত্বক সংবেদনশীল হয়ে পড়ে, ফলে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ সহজে হতে পারে।
- দৃষ্টিশক্তি ক্রমশ কমে আসা: ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি হতে পারে, যা অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।
- কিডনি সমস্যা: রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে, যা ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথির কারণ হতে পারে।
এই উন্নত পর্যায়ের উপসর্গগুলো যদি একবার শুরু হয়, তাহলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায় এবং চিকিৎসা ব্যয়বহুলও হতে পারে। তাই শুরুতেই সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস প্রতিরোধের উপায়
ডায়াবেটিস প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। আপনি যদি সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেন, তাহলে সহজেই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। আসুন জেনে নিই কিভাবে আমরা ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে পারি।
সুষম খাদ্যাভ্যাস
খাবারই হলো আমাদের শক্তির প্রধান উৎস। কিন্তু কী খাচ্ছি, কতটা খাচ্ছি এবং কিভাবে খাচ্ছি, সেটিই ডায়াবেটিস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুষম খাদ্যাভ্যাস মানে এমন খাবার নির্বাচন করা যা শরীরের প্রয়োজন মেটাবে কিন্তু অতিরিক্ত চিনি বা চর্বি যোগাবে না।
- শর্করা কমানো: অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। পরিবর্তে লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) যুক্ত খাবার খান যেমন শস্য, ডাল, ওটস।
- প্রচুর সবজি ও ফলমূল: আঁশযুক্ত শাকসবজি এবং ফলমূল রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার: মাছ, মুরগি, ডিমের সাদা অংশ, ডাল ইত্যাদি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন।
- ভাজা ও তেলে ভাসানো খাবার এড়িয়ে চলুন: অতিরিক্ত চর্বি ও ক্যালোরি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
সুষম খাবার গ্রহণের পাশাপাশি নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। অনিয়মিত খাবার গ্রহণ রক্তে শর্করার মাত্রা অস্থিতিশীল করে তোলে।
নিয়মিত ব্যায়ামের গুরুত্ব
শরীরচর্চা আমাদের শরীরকে শুধু ফিট রাখে না, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাঁদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
- প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা: দ্রুত গতিতে হাঁটা ডায়াবেটিস প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।
- সাইক্লিং বা সাঁতার: এটি শরীরের বিভিন্ন পেশীর উপর সমানভাবে প্রভাব ফেলে।
- ইয়োগা ও স্ট্রেচিং: মানসিক চাপ কমাতে এবং হরমোনের ভারসাম্য রাখতে সহায়ক।
যে ব্যায়ামই করুন না কেন, তা নিয়মিত করতে হবে। শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা রক্তে শর্করা কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়।
ওজন নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন
ওজন নিয়ন্ত্রণ ডায়াবেটিস প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কারণ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মাত্র ৫%–১০% ওজন কমাতে পারলেও ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
ওজন নিয়ন্ত্রণে যা করবেন:
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন: অনেক সময় আমরা ক্ষুধা এবং পিপাসা গুলিয়ে ফেলি। পর্যাপ্ত পানি পান করলে অপ্রয়োজনীয় খাওয়া কম হয়।
- ছোট ছোট ভাগে খাবার খান: দিনে ৫–৬ বারে ছোট ছোট খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে হজম ভালো হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থির থাকে।
- ফাস্টফুড ও প্রসেসড খাবার এড়িয়ে চলুন: এই ধরনের খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ এবং চর্বি থাকে, যা ওজন বৃদ্ধির জন্য দায়ী।
- ঘুমের প্রতি নজর দিন: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ওজন বেড়ে যেতে পারে।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মানে:
- প্রতিদিন এক নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং জাগা।
- মানসিক চাপ কমাতে মেডিটেশন বা প্রার্থনার অভ্যাস গড়ে তোলা।
- ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকা, কারণ এগুলো ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা শুধু ডায়াবেটিস নয়, হৃদরোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপসহ আরও নানা রোগের ঝুঁকি কমায়। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই হতে পারে সুস্থ জীবনের মূল চাবিকাঠি।
ডায়াবেটিস নির্ণয়ের পদ্ধতি
ডায়াবেটিস নির্ণয়ে বিভিন্ন ধরণের টেস্ট করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে যাদের ঝুঁকি বেশি বা উপসর্গ আছে, তাদের জন্য নিয়মিত পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফাস্টিং ব্লাড সুগার (FBS)
এই টেস্টে রক্ত নেওয়ার আগে ৮-১০ ঘণ্টা কিছু খাওয়া যায় না। যদি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৭.০ mmol/L বা তার বেশি হয়, তাহলে ডায়াবেটিস হতে পারে।
ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT)
প্রথমে খালি পেটে রক্ত নেওয়া হয়, তারপর গ্লুকোজ সলিউশন খাওয়ানো হয়। দুই ঘণ্টা পর আবার রক্ত পরীক্ষা করা হয়। ১১.১ mmol/L বা তার বেশি হলে ডায়াবেটিস ধরা পড়ে।
HbA1c টেস্ট
এই পরীক্ষা বিগত ২-৩ মাসের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের চিত্র দেয়। ৬.৫% বা তার বেশি হলে ডায়াবেটিস ধরা পড়ে।
র্যান্ডম ব্লাড সুগার টেস্ট
যেকোনো সময়ে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ১১.১ mmol/L বা বেশি হলে ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা থাকে।
যারা ৪৫ বছর বয়স পার করেছেন, বা পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস আছে, তাদের বছরে অন্তত একবার পরীক্ষা করা উচিত।
ডায়াবেটিসের জটিলতা
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না রাখলে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। এই জটিলতাগুলো ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জীবনমানের অবনতি ঘটায়।
হৃদরোগ ও স্ট্রোক
ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় দ্বিগুণ। রক্তনালিতে চর্বি জমে ব্লক তৈরি হয়, যা হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
কিডনি বিকলতা (ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি)
রক্তে অতিরিক্ত শর্করা কিডনির ছোট ছোট ফিল্টারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে ধীরে ধীরে কিডনি বিকল হয়ে যায়।
চোখের সমস্যা (ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি)
ডায়াবেটিস চোখের রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।
পায়ের ক্ষত ও পচন
স্নায়ু এবং রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হলে পায়ের ক্ষত সারে না। কখনো কখনো আক্রান্ত অঙ্গ কেটে ফেলতে হতে পারে।
ডায়াবেটিসের এই জটিলতাগুলো প্রতিরোধে নিয়মিত চিকিৎসা, খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম এবং সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই জরুরি।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি
ডায়াবেটিস নির্ণয়ের পর প্রথমেই রোগীকে জীবনযাপন পরিবর্তন করতে বলা হয়। তবে অনেক সময় শুধু খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না। তখন প্রয়োজন হয় ওষুধ বা ইনসুলিনের।
টাইপ ১ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা
টাইপ ১ ডায়াবেটিসে রোগীর শরীর একেবারেই ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। তাই সারা জীবন ইনসুলিন ইনজেকশন নিতে হয়। এই ইনসুলিনের মাত্রা চিকিৎসক রোগীর বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা ও খাওয়ার ধরন অনুযায়ী ঠিক করে দেন।
টাইপ ২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা
টাইপ ২ ডায়াবেটিসে প্রথমে ওষুধ ছাড়াই ডায়েট ও ব্যায়ামের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু যদি তাতে কাজ না হয়, তখন ডাক্তার মেটফর্মিন জাতীয় ওষুধ দিতে পারেন। এর বাইরে প্রয়োজন হলে সুলফোনাইল ইউরিয়া, ডিপিপি-৪ ইনহিবিটার, এসজিএলটি-২ ইনহিবিটার ইত্যাদি ওষুধও ব্যবহার করা হয়। কারও ক্ষেত্রে ইনসুলিনও দরকার হতে পারে।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের চিকিৎসা
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে প্রথমে ডায়েট ও ব্যায়ামের পরামর্শ দেওয়া হয়। তাতে কাজ না হলে ইনসুলিন দিতে হতে পারে। কারণ গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে বেশি।
স্মরণ রাখতে হবে, ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই নিজের মতো ওষুধ বা ইনসুলিন ডোজ পরিবর্তন করা বিপজ্জনক হতে পারে।
ডায়াবেটিসে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাব
ডায়াবেটিস শুধু শারীরিক রোগ নয়, মানসিক দিক থেকেও রোগীর উপর প্রভাব ফেলে। কারণ এই রোগের নিয়মিত চিকিৎসা, ডায়েট মেনে চলা এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপ রোগীর মনে উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি করতে পারে।
কেন মানসিক সমস্যা হয়?
- সারাজীবন রোগ বহন করার মানসিক চাপ
- নিজের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে গিয়ে মানসিক দ্বন্দ্ব
- ভবিষ্যতের জটিলতা নিয়ে ভয়
কীভাবে মানসিক চাপ দূর করবেন?
- পরিবারের সাথে কথা বলুন, বন্ধুদের সমর্থন নিন।
- প্রয়োজনে কাউন্সেলরের সহায়তা নিন।
- মেডিটেশন ও যোগাভ্যাস মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবে সুস্থ থাকাটাও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য তালিকার নমুনা
সঠিক খাদ্য তালিকা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য জীবন বাঁচানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একটি নমুনা ডায়াবেটিস ফ্রেন্ডলি খাদ্য তালিকা দেওয়া হলো।
| সময় | খাবার |
| সকালের নাশতা | ১টি সিদ্ধ ডিম, ১ কাপ ওটস বা আটার রুটি, ১ কাপ চিনি ছাড়া চা |
| দুপুরের খাবার | ১ কাপ ভাত বা ২টি রুটি, প্রচুর সবজি, ১ টুকরা মাছ বা মুরগি (চর্বি ছাড়া), ডাল |
| বিকালের নাশতা | ১টি আপেল বা ১ কাপ ছোলা ভাজা |
| রাতের খাবার | ২টি রুটি, শাকসবজি, মুরগি বা ডাল |
| রাতের শেষে | ১ গ্লাস দুধ (লো ফ্যাট) |
খাদ্য তালিকা অবশ্যই ডাক্তার বা পুষ্টিবিদের পরামর্শে ঠিক করা উচিত কারণ এটি বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা অনুসারে ভিন্ন হতে পারে।
ডায়াবেটিস নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
অনেকের মধ্যেই ডায়াবেটিস নিয়ে নানা ভুল ধারণা কাজ করে, যা রোগ নিয়ন্ত্রণে বড় অন্তরায় হতে পারে।
ভুল ধারণা ১: মিষ্টি খেলেই ডায়াবেটিস হয়
বাস্তবতা হলো, শুধু মিষ্টি খাওয়ার কারণে ডায়াবেটিস হয় না। বংশগত কারণ, ওজন, অলস জীবনযাপন ইত্যাদি বড় কারণ।
ভুল ধারণা ২: ডায়াবেটিস মানেই ইনসুলিন নিতেই হবে
সব ডায়াবেটিসে ইনসুলিন প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রথমদিকে ওষুধ ও জীবনযাপনের পরিবর্তনে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ভুল ধারণা ৩: ডায়াবেটিস হলে স্বাভাবিক জীবন সম্ভব নয়
ডায়াবেটিস থাকলেও সঠিক চিকিৎসা, খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের মাধ্যমে একজন মানুষ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
ডায়াবেটিস আজকের দিনে একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যা। তবে সুসংবাদ হলো, সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত পরীক্ষা করে সহজেই এই রোগের ঝুঁকি কমানো যায়। যারা ইতিমধ্যেই আক্রান্ত, তারা চাইলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ, সুন্দর জীবনযাপন করতে পারেন। মনে রাখুন, ডায়াবেটিস মানেই জীবন শেষ নয়—এটি সঠিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রিত একটি শারীরিক অবস্থা মাত্র।
FAQs
১. ডায়াবেটিস কি পুরোপুরি ভালো হয়?
না, ডায়াবেটিস পুরোপুরি ভালো হয় না। তবে চিকিৎসা, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের পরিবর্তনে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
২. ডায়াবেটিসের জন্য কি শুধু মিষ্টি বাদ দিলেই হবে?
না। শুধু মিষ্টি বাদ দিলেই হবে না। সামগ্রিকভাবে সুষম খাদ্য ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন জরুরি।
৩. কি বয়স থেকে ডায়াবেটিসের পরীক্ষা শুরু করা উচিত?
যদি পরিবারের মধ্যে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকে বা ওজন বেশি হয়, তাহলে ৩০ বছরের পর থেকে নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। অন্যদের ৪৫ বছরের পর পরীক্ষা শুরু করা ভালো।
৪. গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের পর কি ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে?
হ্যাঁ। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস যাদের হয়েছিল, পরবর্তীতে তাদের টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
৫. ডায়াবেটিস রোগীরা কি ফল খেতে পারেন?
হ্যাঁ, কিন্তু লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স যুক্ত ফল বেছে নিতে হবে যেমন আপেল, কমলা, পেয়ারা।